বিশ্ব শিক্ষক দিবস

আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস

খাদিমুল ইসলাম সাইফুল:

দিবস টি কে সামনে রেখে আমার শিক্ষা জীবনের সকল শিক্ষকদের প্রতি রইলো শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা বাবা -মায়ের পরেই হচ্ছে শিক্ষকদের স্থান। কারণ তারাই আমাকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।

শিক্ষাজীবনের চিত্র : ছোটবেলায় আমার বয়স যখন ৫ বছর ঠিক তখন থেকে আমার স্কুলে যাওয়া শুরু যা ২০০০ সালের জানুয়ারির শেষের দিকে যেটি রাজারহাট উপজেলার একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে ১৯১৮ খ্রিঃ স্থাপিত গতিয়াশাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

কিন্তু এই স্কুলে আমার যাওয়া -আসার সময়কাল ছিল মাত্র ৫ থেকে ৭ দিন। যদিও কম সময় ছিলাম বিদ্যালয় টিতে কিন্তু অত্যন্ত ধৈর্যশীল ব্যক্তি ছিলেন আঃ আজিজ স্যার কারন তার মাধ্যমেই আমার শিক্ষাজীবন শুরু অর্থাৎ হাতেখড়ি। আমি তার সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনা করছি।

যে কারনে বিদ্যালয় ত্যাগ করতে হয়েছিল আমাকে তার মূল কারন হচ্ছে আগে বাবা /দাদা এবং গ্রাম্য লোকের একটা সাধারণ প্রবাদ ছিল, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নাকি পড়ালেখা কম হয়। এই অহেতুক প্রবাদের সাথে হিমশিম খেয়ে আমাকে বিদ্যালয় ছাড়তে বাধ্য হওয়া লাগলো।

তাই পরবর্তী তে ঐ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে ভর্তি হলাম চায়না বাজার রেজি: বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে (বর্তমানে সরকারি প্রাঃ বিদ্যাঃ)। এই স্কুলে এসে আবার নতুন নতুন স্যার, ম্যামদের ভালোবাসা পেতে শুরু করলাম। আমার গনিতের স্যার ছিলেন জনাব মনির উদ্দিন সরকার (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) । তিনি আমাদের সুন্দর ভাবে ১,২.৩ বানান সহ নামোতাও পড়াতেন এবং অঙ্কে লেখা ও কথায়লেখা এগুলো শেখাতেন যা অতুলনীয়। তিনি শুধু শিক্ষকই ছিলেন না কারন তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধাও বটে।

বিশেষ করে আমার প্রিয় ব্যক্তিত্বের মধ্যে একজন তিনি হলেন অত্র প্রতিষ্ঠানের সহকারী শিক্ষিকা জনাবা রোকসানা পারভিন (জেলি) ম্যাম। তিনি ছিলেন আমার বাংলার শিক্ষক। অত্যন্ত যত্নসহকারে অ,আ, ক, খ আমাদেরকে শেখাতেন।

তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি এলাকার দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের কে লেখাপড়ার জন্য বিভিন্ন ভাবে সহযোগীতা করতেন। আমার দৃষ্টিতে তিনি নারী জয়িতা পাওয়ার যোগ্য। আরও একজন ম্যাম ছিলেন অত্যন্ত প্রিয় যিনি সমাজ,রাষ্ট্র নিয়ে আলোচনা করতেন তিনি হলেন জনাবা ফিরোজা ম্যাডাম। সমাজে কিভাবে বসবাস করতে হয় এবং চলতে হবে এগুলো সুন্দরভাবে শিখিয়ে দিতেন তিনি।

তবে সব ম্যাডামরা ছিল আমার সম্পর্কে ভাবি। তারা আমাকে ছোট ভাইয়ের মতো আদর, স্নেহ দিয়ে শেখাতেন। তবে আমার কাছে প্রধান শিক্ষক স্যার জনাব ছয়ফুল ইসলাম মন্জু স্যারও ছিলেন খুবই প্রিয়। কারন তিনি আমাদের ইংরেজি ক্লাস নিতেন।

সুন্দর ভাবে A,B,C,D এগুলো বর্ণ চেনা এবং ছন্দে ছন্দে বিভিন্ন ছড়া শেখাতেন। যা অতুলনীয়। এইভাবেই স্যার, ম্যামদের ভালোবাসার মধ্য দিয়েই আমি প্রাথমিক স্তরের লেখাপড়া শেষ করে দিয়ে হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছি। হাইস্কুল জীবনে যেসকল স্যারের সান্নিধ্য পেয়েছি…. বিশেষ করে আমার গনিতের শিক্ষক আলেফ উদ্দিন স্যার ক্লাসে মাঝে মাঝে একটি প্রবাদবাক্য বলতেন, “ভাগ্যের লিখন না হয় দ্বি- খন্ডন।

আসলে বিষয় টা হচ্ছে ভাগ্যে যা লেখা থাকে তা কখনো দ্বিখণ্ডিত হয় না কিন্তু ভাগ্য কে পরিবর্তন করতে হলে নিজেকে কঠোর পরিশ্রমী হতে হয়। ইংরেজি স্যার জনাব আহসান হাবিব স্যার আমাদেরকে সুন্দর ও যত্নশীল ভাবে ইংরেজি গ্রামার শেখাতেন এবং ইংরেজিতে একটি প্রবাদ বাক্য প্রায়ই উপস্থাপন করতেন, ” Handsome is that, handsome does. (অর্থাৎ যে সুন্দর তার কাজও সুন্দর) ।

তারমানে যার চরিত্র, আচার -আচরণ সুন্দর তার কাজও সুন্দর। তিনি এটাই আমাদের কে বুঝিয়ে ছিলেন। বিশেষ করে আমার লেখাপড়ার জন্য আমার বাবা -মাকে যিনি সর্বদা সাহস জুগিয়েছিলেন তিনি হলেন সরকার বাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়র সাবেক সহকারী প্রধান শিক্ষক এবং বর্তমানে সিংগারডাবড়ীহাট বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জনাব আরিফুল ইসলাম স্যার।

তিনি আমাকে এবং আমার পিতা -মাতা কে বলতেন, শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। তাই শিক্ষা অর্জন করতে হবে। তিনি এভাবেই আমার পড়ালেখার জন্য আমার পরিবারকে সাহস জুগিয়েছিলেন। তবে আরেকজন স্যারের কথা না বললেই নয় তিনি আবার আমার নানাজিও বটে। তিনি হলেন আলম বাদশা স্যার। সর্বদা রসাত্মক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি প্রায় ক্লাসে বলতেন কি খবর আবদারের নাতি তোর কাছে একটা আবদার ছিল ? একথা বলার কারণ ছিল আমার নানাজির নাম ছিল আবদার আলী।

এজন্য এভাবেই ক্লাসে আমাকে বলতেন এবং আরও বলতেন আমার নানাজির কাছে নাকি যেকোনো জিনিস আবদার করা মাত্রই সেই আবদারটুকু পূরণ করতেন। আবার আরেকজন স্যারের কথা না বললেই নয় যিনি আমার অত্যন্ত কাছের ব্যক্তি ছিলেন এবং বাবার বাল্যকালের বন্ধুও বটে তিনি হলেন মরহুম শফিকুল ইসলাম (দুলাল)। তিনি আমাদের ইসলাম শিক্ষা ক্লাস নিতেন এবং ক্লাসে অনেক মজার মজার গল্প শোনাতেন যা কখনো ভুলাবার মতো নয়। তবে স্যার আজ আর আমাদের মাঝে নেই।

তিনি ২০১৩ ইং সনের ২৬ শে ডিসেম্বর স্ট্রোক করে পরলোক গমন করেন। কিন্তু স্যারের এই অকাল মৃত্যুতে আমরা এখনো শোকাহত। যদিও কুরআনে বলা আছে, সকল প্রানীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহন করতে হবে। কিন্তু স্যারের এই মৃত্যুটাকে আমরা এখনো মেনে নিতে পারছি না। স্যারের কথা মনে পরলে এখনো চোখে কান্না এসে যায় কারন তিনি মৃত্যুর পূর্ববর্তী ১ ঘন্টা আগে স্থানীয় এক বাজারে আমার সাথে অনেক হাসিঠাট্টা ও আমোদ করেছিল যা এখন চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।

মহান রব্বুল আলামীন যেন আমার স্যারকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করে আমি সর্বদা সেই কামনাটুকুই করি। তাছাড়াও রমজান আলী (লালু) স্যার, মাহমুদা ম্যাম, হারুন অর রশীদ স্যার,অনিমেষ স্যার ও মোফাজ্জল স্যার সহ সকল স্যারই আমার কাছে পছন্দনীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

তবে প্রধান শিক্ষক জনাব আসাদুজ্জামান স্যার কে খুবই ভয় পেতাম কারণ তিনি হলেন হাইস্কুল শিক্ষাঙ্গন পরিবারের অভিভাবক। কিন্তু তিনিও হাস্যজ্বল এবং আমার পছন্দনীয় ব্যক্তি। আজ সব স্যারদের কে মিস করতেছি। আমার সকল স্যারদের কে জানাই কৃতজ্ঞতা ও শুভ কামনা ।