উত্তরের বন্যা এবং আমাদের প্রস্তুতি – আব্রাহাম লিংকন

উত্তরের বন্যা এবং আমাদের প্রস্তুতি – আব্রাহাম লিংকন

আব্রাহাম লিংকনঃ
দ্বিতীয় দফার বন্যায় কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, দিনাজপুর ঠাকুরগাঁও, গাইবান্ধা ও নওগাঁ নিমজ্জিত। এবারের বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কুড়িগ্রাম। এর পরপরই লালমনিরহাট। ইতিমধ্যে পানির নিচে সমগ্র যোগাযোগ ব্যবস্থা। দু’দিন ধরে ট্রেন বন্ধ। পানির নিচে রেললাইন। কুড়িগ্রামে বোয়ালিয়া ব্রিজের একাধিক গার্ডার পানির স্রোতে ভেসে গেছে। এই বন্যায় ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার, আত্রাই, করতোয়াসহ প্রধান প্রধান নদ-নদীবেষ্টিত প্রায় হাজারখানেক চরের মানুষ বরাবরের মতো পানিবন্দি হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, এবার ধরলা নদীর পানির উচ্চতা গত শতাব্দীর সব রেকর্ডকে পিছু ফেলেছে। এই পানির উচ্চতার কারণে কুড়িগ্রাম জেলার উঁচুভূমিগুলোও পানির নিচে। কুড়িগ্রাম সদরের কাঁঠালবাড়ী, রাজারহাটের ছিনাই, চাকিরপশার আজকে পানির তলে, যা কস্মিনকালেও ভাবা যায়নি। লন্ডনে বিড়াল খেলায় ব্যস্ত খালেদা জিয়া সরকারের যতই নিন্দা করুন বন্যায় মানুষের পাশে কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, সীমিত অর্থে জেলা পরিষদ সবাই ২৪ ঘণ্টা নিরন্তর ছুটছে।

এবার বন্যার যে চিত্র বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া যাচ্ছে তাতে দেখা যাচ্ছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলায় ২৩৩ মিলিমিটার এবং জলপাইগুড়িতে ২৯৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। বর্তমানে জেলা দুটি পানির নিচে। কোচবিহারের সঙ্গে রেল ও সড়ক উভয় পথেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। একই সঙ্গে আসামেও চলছে ব্যাপক বন্যা, সেখানেও বন্যায় ৮৯ জনের প্রাণহানি হয়েছে। বৃষ্টি ও উজান থেকে ধেয়ে আসা বানের পানি বাংলাদেশের দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা, নওগাঁ ও রংপুরের একাংশ দিয়ে নদ-নদীযোগে বঙ্গোপসাগরের দিকে যাচ্ছে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, বন্যার পানি অল্প কয়েক দিনেই নেমে যাবে। কিন্তু এ কয়েক দিনেই যে ক্ষতি হলো তা কোটি কোটি ডলারে হিসাব করতে হবে। একাধিক স্থানে নদীশাসন বাঁধ ভেঙে গেছে। শত শত কিলোমিটার রাস্তা বিনষ্ট। গরিব মানুষের ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত। এগুলো ঠিক করতে বা নির্মাণ করতে বেশ ব্যয় ও সময় নিলেও ব্যক্তি ও রাষ্ট্র সেগুলো এক সময় অবশ্যই করবে। কিন্তু জরুরি কিছু বিষয় আছে যা এখনই করা দরকার; যা না করলে মানবিক বিপর্যয় হবে। উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোর পানিবন্দি মানুষের বিপদ উতরানোর জন্য কয়েকটি সুপারিশ করছি, যা বাস্তবায়িত হলে মানুষের অনেক কষ্ট লাঘব হবে।

যে সুপারিশগুলো এখনই করা দরকার:
ক. পানিবন্দি মানুষের কাছে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি পৌঁছানো;
খ. শিশুখাদ্যের জোগান দেওয়া, কারণ সবাই বয়স্কদের নিয়ে ভাবেন;
গ. বাঁধ বা উঁচু ভিটায় আশ্রয় নেওয়া মানুষের জন্য কালো বা রঙিন ভারী পলিথিন বেড়ার ঘেরা দিয়ে অস্থায়ী ল্যাট্রিন স্থাপন;
ঘ. সাপের কামড়ের ইনজেকশনসহ নিরাপদ স্বাস্থ্যের জন্য চিকিৎসা টিম দিয়ে সার্বক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ ও আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর চারদিকে কার্বলিক এসিডের ব্যবস্থা করা; ঙ. পশুখাদ্যের জোগান দেওয়া এবং
চ. চলমান বন্যায় আক্রান্তদের এনজিও ও ব্যাংকের প্রদত্ত ঋণের সব কিস্তি বন্ধ করা।

বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যা করা দরকার, এটিকে আমরা সহযোগিতার দ্বিতীয় পর্যায় বলতে পারি।

চারা বীজ ও বীজ দেওয়া:
দু’দিন আগেও সমগ্র উত্তরাঞ্চলে মাঠের পর মাঠ রোপিত ধানের গাছ সবুজ হয়ে গিয়েছিল। আজ শুধু পানি আর পানি, যেন ঢেউছাড়া সমুদ্র। বিলম্ব ও আগাম প্রজাতির পাকা পাড়ি ও আটাশ ধানের অনেক ক্ষেত একমাথা পানিতে ডুবে আছে। সেগুলো সব পচে যাচ্ছে। বাংলাদেশের খাদ্যভাণ্ডার হচ্ছে সমগ্র উত্তর জনপদ। সেই উত্তরবঙ্গ আজ পানির নিচে। উত্তরবঙ্গের আকর্ষিক এই বন্যায় ফসলহানি সমগ্র দেশকে সংকটে ফেলবে। এই সংকট মোকাবেলায় সরকার হয়তো চাল-গম দেশ-বিদেশ থেকে সংগ্রহ করে মেটাবে। কিন্তু কৃষকের বিপুল পরিমাণ জমি, চারা, বীজের অভাবে অনাবাদি থেকে গেলে তা কৃষকের মেরুদণ্ডে বিরাট ক্ষত ধরিয়ে দেবে, যা জাতীয় ক্ষতি বটে। এই সংকট কাটানোর জন্য দেশের দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চল থেকে চারা সংগ্রহ করে আগামী ১০-১৫ দিনের মধ্যে সেই ধানের চারা গাছগুলো কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ করা। এক একর পর্যন্ত জমির মালিককে বিনা মূল্যে চারা বীজ সরবরাহ করা। তাহলে কৃষক পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে সে ধান লাগাতে পারবে। না হলে এই মৌসুমে জমি পতিত হয়ে পড়ে থাকবে। একই সঙ্গে চরাঞ্চলের জমির জন্য ডাল, চীনা, সরিষাসহ রবিশস্যের নানা বীজ দ্রুত সরবরাহ করা, যাতে পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কৃষক সেগুলো কাদায় ছিটিয়ে দিতে পারবে।

ঋণ ও ঋণের কিস্তি:
যেসব প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বিভিন্ন ব্যাংক, এনজিও ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ক্ষুদ্র ঋণ নিয়েছে, তাদের কিস্তি আগামী ছয় মাস পর্যন্ত বন্ধ রাখা। যারা ঋণের টাকায় ফসল লাগিয়েছিলেন বা ছোট্ট খামার গড়েছিলেন, সেগুলো বানের তোড়ে ভেসে গেছে বা বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের ঋণ পুরো বা আংশিক মওকুফ করা। নতুন করে বিনা সুদে বা নামমাত্র সুদে ঋণ দেওয়া। মওকুফকৃত বা স্থগিত ঋণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংক, পিকেএসএফ সরকারের অনুমোদনক্রমে সেটি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র নির্বাহী আদেশ দিয়ে বিষয়টির সুরাহা টানতে পারে। নতুবা এনজিওগুলো বিপদগ্রস্ত হতে পারে।

পুনর্বাসন কর্মসূচি :বন্যা ও দুর্যোগে যাদের ঘরবাড়ি বিনষ্ট হয়েছে, তাদের সহযোগিতা করার জন্য জেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসনকে বিশেষ তহবিল দেওয়া। সোসাল সেপ্টিনেটের আওতায় সমগ্র উত্তরবঙ্গকে নেওয়া। বন্যার পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি চালু করা। কাবিখা-টাবিখা, ন্যায্যমূল্যে চাল-আটা বিক্রি করা, ১০ টাকার চাল বিতরণ কর্মসূচি গ্রাম পর্যায়ে ব্যাপকায়ন করা। বিতরণ দুর্নীতিমুক্ত ও সহজ করা।

বন্যাপীড়িত কুড়িগ্রাম জেলার তাজুল ইসলাম চৌধুরী ও মাঈদুল ইসলাম মুকুল জাতীয় পার্টির দু’জন সাংসদ বন্যা এলাকার প্রতিনিধি হলেও তাদের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক নেই। তারা এলাকায় নেই অথচ তাদের এলাকার বানভাসি বিশাল জনগণ দুর্ভোগে আছে। তারা যেহেতু দায়িত্ব পালন করছেন না বা দায়িত্ব পালনের মতো বয়স, শরীর ও স্বাস্থ্য কোনোটাই তাদের নেই, তাই বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনের জন্য বা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার জন্য যে বরাদ্দ দেওয়া হবে, তা তাদেরকে না দিয়ে সে বরাদ্দ জেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসনকে দেওয়া।

শিক্ষা সংক্রান্ত:
বন্যার কারণে যেসব স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়েছে, তাদের ছাত্রদের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার জন্য পরে বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করা। এ জন্য প্রয়োজন হলে শিক্ষকদের বাড়তি সম্মানী দেওয়া। বর্তমান বন্যাকালকে ছাত্রদের শিক্ষা ছুটি হিসেবে গণ্য করা। শিক্ষক ও কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করে সংশ্লিষ্ট ক্যাচমেন্ট এরিয়ায় বন্যার্তদের জন্য ত্রাণশিবির বা বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রের তদারকি ও সহযোগিতা করার জন্য দায়িত্ব প্রদান করা।

ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবেলায় কিছু প্রস্তাব:
ক. নৌকা ও তাঁবুর ব্যবস্থা রাখা। এবারে বন্যায় নৌকা সংকট ধর্তব্য মাত্রায় ছিল। বর্তমান সময়ে বিভিন্ন নদ-নদীতে ব্রিজ-কালভার্ট হওয়ার কারণে নৌকার ব্যবহার কমেছে। মানুষ আগে মূলত পারাপারের জন্য নৌকা ব্যবহার করত; তবে বন্যার সময় এর ব্যবহার বেশ চোখে পড়ার মতো ছিল। আজ নৌকার ব্যবহার অনেক কমেছে। এর মূল কারণই হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি। এবারের আকর্ষিক বন্যায় মানুষ নৌকার জন্য নাকাল ছিল। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের উদ্যোগে স্পিডবোটসহ কিছু নৌকা রাখা উচিত;
খ. যারা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ বা উঁচু স্থানে সাময়িক আশ্রয় নেবেন, তাদের জন্য তাঁবু;
গ. ভাসমান টয়লেট সরবরাহ করা;
ঘ. লাইফ জ্যাকেট সরবরাহ করা। লাইফ জ্যাকেট ব্যক্তিগত পর্যায়ে কিনে রাখার জন্য উজ্জীবিত করা। নদী-তীরবর্তী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ইউনিয়ন পরিষদের সংগ্রহে লাইফ জ্যাকেট রাখা;
ঙ. নদী-তীরবর্তী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের দিয়ে নিয়মিত রেসকিউ টিম গঠন করা। স্কাউট ও বিএনসিসিকে এই কাজে লাগানো। অংশগ্রহণকারী ছাত্রদের উচ্চশিক্ষায় ও কর্মে প্রবেশে এই অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করা;
চ. বিজিবিকে রেসকিউ টিমে যুক্ত করা, বিজিবির সব সদস্যই সাঁতার জানে। তারা নদী ও সীমান্তে রাষ্ট্রের নানা কাজে সেবা দিয়ে থাকে। এই বাহিনীকে বন্যাকালীন উদ্ধার, ত্রাণশিবিরে সহযোগিতার জন্য কাজে লাগানো।

নদীশাসন:
অপরিকল্পিত বাঁধ অপসারণ করে দরকারি নদীশাসন করা। নদীগুলোর ড্রেজিং করে নাব্য ফিরিয়ে আনা। নদীগুলোকে দখলমুক্ত করা। প্রাকৃতিক জলাধারগুলোকে পরিচর্যা করা। উজানের রাষ্ট্রের সঙ্গে গ্রীষ্ম ও বর্ষায় জল বণ্টনে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা।

অবকাঠামোগত সুপারিশ:
জলদুর্যোগ মোকাবেলায় নির্মাণ পরিকল্পনায় কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজন আছে। আমাদের দেশে সরকারি ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে স্থপতিরা ভূমিকম্প মোকাবেলার বিষয়টিকে বিবেচনায় নিলেও বন্যার সময় একটি ভবনের বহুমুখী ব্যবহারের বিষয়টি মাথায় রাখেন না। কিন্তু পরিবেশগত কারণে নদী-তীরবর্তী এলাকার নির্মাণ বা অবকাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে বন্যাকে অবশ্যই বিবেচনা করা উচিত। চরাঞ্চলে বা নদী-তীরবর্তী এলাকায় সরকারি যত ভবনই হোক সেটি বিপদের সময় যাতে বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা যায়, সেভাবেই নির্মাণ করা। কোস্টাল বেল্টে এর প্রয়োগ থাকলেও নদী-তীরবর্তী এলাকাগুলোতে দু’একটি ব্যতীত তেমনটি দেখা যায় না। অর্থাৎ একটি ভবনের বহুমুখী ব্যবহার থাকতে হবে।

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। আমাদের জীবনের সঙ্গে বন্যা থাকবেই। এই বন্যা মোকাবেলা করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

বন্যাকে ভয় নয়, জয় করেই আমাদের টিকে থাকতে হবে।

লেখকঃ আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট। সাবেক রাকসু নেতা। সভাপতি, কুড়িগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি। সিনেটর, রিভারাইন পিপল।
ইমেইলঃ abrahamlincoln66@gmail.com

সূত্রঃ http://www.ulipur.com/?p=4176

One thought on “উত্তরের বন্যা এবং আমাদের প্রস্তুতি – আব্রাহাম লিংকন

Leave a Reply

Your email address will not be published.